সব রক্ষণাবেক্ষণ গাইড
8 মিনিটের পড়া · আপডেট 2026-10-15
সেকেন্ড-হ্যান্ড অয়েল-কুলড ফুয়েল-ইনজেক্টেড বাইক কেনার আগে কী দেখবেন
Bajaj Pulsar N160, NS160 ও N250, Suzuki Gixxer 250 ও Gixxer SF 250, Hero Thriller 160R 4V, Hero XPulse 200 4V আর Royal Enfield-এর 350 মডেলগুলোর মতো অয়েল-কুলড এফআই বাইকের জন্য। এগুলোতে ইঞ্জিন অয়েল তাপও সরায়, তাই অয়েলের পরিমাণ আর অবস্থা অনেক কিছু বলে দেয়।
যা লাগবে
- একটি টর্চ, পরিষ্কার ন্যাকড়া, আর বাইক বোঝেন এমন বন্ধু বা মেকানিক
- টেস্ট রাইডের জন্য নিজের লাইসেন্স আর হেলমেট
ধাপগুলো
- বাইক দেখার আগেই কাগজ দেখতে চান: BRTA রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট (স্মার্ট কার্ড, বা পুরনো ব্লু বুক), ট্যাক্স টোকেন, ইন্স্যুরেন্সের কাগজ আর বিক্রেতার এনআইডি। মোটরসাইকেলে ফিটনেস সার্টিফিকেট লাগে না, তাই ওটা খোঁজার দরকার নেই।
- রেজিস্ট্রেশনের নাম আর বিক্রেতার এনআইডির নাম মিলিয়ে দেখুন। বাইক অন্য কারো নামে থাকলে, মালিকানা বদলের কাগজে আসল মালিককেই আপনার সাথে সই করতে হবে। সেই সই ছাড়া BRTA বাইক আপনার নামে করবে না।
- চেসিস নম্বর (ফ্রেমে খোদাই করা, সাধারণত হ্যান্ডেলের নিচে স্টিয়ারিং হেডের কাছে) আর ইঞ্জিন নম্বর (ইঞ্জিনের কেসিংয়ে) পড়ুন। দুটোই রেজিস্ট্রেশনের সাথে হুবহু মিলতে হবে। ঘষা, নতুন করে খোদাই করা, রং দিয়ে ঢাকা বা এলোমেলো অক্ষর দেখলে সেখানেই কেনা বাদ দিন।
- নম্বর প্লেট হতে হবে BRTA-র দেওয়া ডিজিটাল (রেট্রো-রিফ্লেক্টিভ) প্লেট, আর নম্বর কাগজের সাথে মিলতে হবে। হাতে বানানো বা না-মেলা প্লেট হলে পরিষ্কার ব্যাখ্যা চান।
- ট্যাক্স টোকেনের মেয়াদ কবে শেষ দেখুন। মেয়াদ পেরিয়ে গেলে বকেয়া আর জরিমানা সাধারণত পরের মালিকের ঘাড়েই পড়ে, তাই টাকা দেওয়ার আগেই ঠিক করুন কে দেবে।
- বাইকের নামে কোনো ট্রাফিক মামলা বা ই-ফাইন বাকি আছে কি না জিজ্ঞেস করুন, আর টাকা দেওয়ার আগে নিজে অফিসিয়াল অনলাইন সেবায় যাচাই করুন (কীভাবে, তা আমাদের ই-ফাইন গাইডে আছে)। বকেয়া মামলা বাইকের সাথেই থেকে যায়।
- একটি বিক্রয় রসিদ লিখুন: দুজনের এনআইডি নম্বর, তারিখ, দাম, চেসিস আর ইঞ্জিন নম্বরসহ, আর দুজনেই সই করুন। তারপর দেরি না করে BRTA-তে মালিকানা বদল করুন। সেটা না হওয়া পর্যন্ত আইনত বাইক বিক্রেতার নামেই থাকে।
- স্টার্টের আগে, ইঞ্জিন ঠান্ডা আর বাইক সোজা রেখে সাইট গ্লাস বা ডিপস্টিকে অয়েল দেখুন। দুই দাগের মাঝে থাকা উচিত। অয়েল-কুলড ইঞ্জিনে অয়েল কম মানে ইঞ্জিন দরকারের চেয়ে বেশি গরমে চলেছে।
- অয়েলের রং দেখুন। নতুন অয়েল হালকা সোনালি, পুরনো হলে গাঢ় হয়, এটা স্বাভাবিক। দুধের মতো বা ফেনা ওঠা অয়েল মানে পানি ঢুকেছে (বন্যা, বা অসাবধানে ধোয়া); পোড়া গন্ধ বা চিকচিকে ধাতুর কণা খারাপ লক্ষণ। শেষ অয়েল বদলের রসিদ বা সার্ভিস বুকের সিল দেখতে চান।
- অয়েল কুলার আর লাইন: এগুলোর বেশির ভাগে সামনে ছোট রেডিয়েটরের মতো একটা অয়েল কুলার থাকে, হোস বা ধাতব পাইপ দিয়ে অয়েল যায়। পাত বাঁকা, থেঁতলানো বা কাদায় বোজা কি না দেখুন, আর লাইন ও জোড়াগুলোয় আঙুল বুলিয়ে দেখুন। তেলতেলে ভাব, বাইকের নিচে নতুন ফোঁটা, বা কোনো একটা জোড়া সন্দেহজনকভাবে ঝকঝকে মোছা থাকলে ব্যাখ্যা চান। টোল খাওয়া কুলার পড়ে যাওয়ারও চিহ্ন।
- বিক্রেতাকে বলুন আপনি পৌঁছানোর আগে যেন বাইক স্টার্ট বা চালানো না হয়, আর গিয়ে ইঞ্জিনে হাত দিয়ে দেখুন। ঠান্ডা থাকা উচিত। গরম ইঞ্জিনে স্টার্টের সমস্যা, ধোঁয়া আর শব্দ লুকিয়ে যায়।
- স্টার্ট দিয়ে সাইলেন্সারের দিকে তাকান, তারপর কয়েকবার রেভ দিন। ঠান্ডা সকালে হালকা সাদা বাষ্প এক মিনিটে মিলিয়ে গেলে স্বাভাবিক। নীল বা ধূসর ধোঁয়া মানে ইঞ্জিন অয়েল পুড়ছে (রিং বা ভালভ সিল ক্ষয়)। কালো ধোঁয়া মানে তেল বেশি পুড়ছে, মিক্সচার রিচ।
- আইডলে আর গরম হওয়ার সময় কান পাতুন। হালকা, সমান টিকটিক শব্দ স্বাভাবিক। ওপর থেকে জোরে ঠকঠক, নিচ থেকে ধাক্কার মতো শব্দ, স্টার্টের পর প্রথম কয়েক সেকেন্ড ঝনঝন, বা ঘষার শব্দ ভালো লক্ষণ নয়। সিলিন্ডার হেড আর সিলিন্ডারের গোড়ায় অয়েল চুইয়ে পড়ছে কি না দেখুন।
- স্টার্ট নিতে কষ্ট, টান কম আর সাথে নীল ধোঁয়া মানে ইঞ্জিনের ওপরের অংশ ক্লান্ত (কম্প্রেশন কম)। মেকানিক গেজ দিয়ে কয়েক মিনিটেই কম্প্রেশন মেপে দিতে পারেন।
- এগুলোও ফুয়েল-ইনজেক্টেড: চাবি অন করলে এফআই লাইট অল্প সময় জ্বলে স্টার্টের পর নিভে যাওয়া উচিত, ফুয়েল পাম্প এক মুহূর্ত গুনগুন করবে, আর ঠান্ডায়ও ঝামেলা ছাড়া স্টার্ট নেবে। পুরো তালিকা এয়ার-কুলড এফআই গাইডে আছে।
- টেস্ট রাইডের পর তাপ পরীক্ষা: কয়েক মিনিট আইডলে চলতে দিন। টেম্পারেচার গেজ বা লাইট থাকলে স্বাভাবিক থাকা উচিত। গরম হলে টান কমে যাওয়া, গরম অয়েলের কড়া গন্ধ বা ওয়ার্নিং লাইট মানে অয়েল কম, ভুল গ্রেড, বা কুলার বন্ধ হয়ে আছে।
- ক্লাচ স্লিপ টেস্ট: উঁচু গিয়ারে কম গতিতে হঠাৎ থ্রটল খুলুন। রেভ লাফিয়ে উঠল কিন্তু বাইক তেমন জোরে গেল না, মানে ক্লাচ প্লেট ক্ষয়ে গেছে। নিউট্রালও সহজে পাওয়া উচিত, আর লিভারে একটু ঢিলা থাকা উচিত।
- চেইন আর স্প্রকেট: পেছনের স্প্রকেটের পেছন দিক থেকে চেইন টেনে তোলার চেষ্টা করুন। অনেকখানি উঠে ফাঁক দেখা গেলে চেইন লম্বা হয়ে গেছে। দাঁত হুকের মতো বা সুচালো হলে চেইন আর দুই স্প্রকেটই বদলানোর সময়।
- দুর্ঘটনার চিহ্ন: হ্যান্ডেলের মাথা, লিভার, ফুটপেগ, আয়না বা ইঞ্জিন কাভারে ঘষার দাগ; ট্যাংকে টোল; বাকিগুলোর সাথে না-মেলা নতুন প্যানেল; ফ্রেমে ওয়েল্ডিং বা নতুন রং। সামনে আর পেছনে দাঁড়িয়ে দেখুন: দুই চাকা এক লাইনে থাকা উচিত, আর সামনের চাকা সোজা থাকলে হ্যান্ডেলও সোজা থাকা উচিত।
- ফর্ক আর স্টিয়ারিং: ফর্কের চকচকে টিউবে অয়েল, মরচে বা ছোট গর্ত আছে কি না দেখুন। সামনের দিক কয়েকবার চেপে ছাড়ুন; মসৃণভাবে উঠে আসা উচিত, ঠকঠক শব্দ ছাড়া। হ্যান্ডেল এক পাশ থেকে আরেক পাশে ঘোরান; মসৃণ হওয়া উচিত, আটকে আটকে বা ঢিলা নয়।
- বন্যার ক্ষতি, বর্ষার পর যা প্রায়ই দেখা যায়: যেখানে ধোয়ার পানি পৌঁছায় না সেখানে শুকনো কাদা বা পলি (সিটের নিচে, এয়ার বক্সে, তারের প্লাগের আশপাশে, হেডলাইটের পেছনে), কানেক্টরে সবুজ বা সাদা আস্তর, বাইকের নিচের দিকের বোল্টে মরচে, হেডলাইট বা মিটারের ভেতরে ঝাপসা ভাব বা পানির দাগ, স্যাঁতসেঁতে গন্ধ, আর দুধের মতো ইঞ্জিন অয়েল।
- ওডোমিটার: শুধু সংখ্যার ওপর ভরসা করবেন না। মেকানিক্যাল আর ডিজিটাল দুই ধরনের মিটারই পিছিয়ে দেওয়া যায়। সার্ভিস বুকের সিলের সাথে মিলিয়ে দেখুন, আর গ্রিপ, ফুটপেগের রাবার, গিয়ার লিভার, ব্রেক প্যাডেল, সিট, টায়ার আর চেইনের ক্ষয়ের সাথে। কিলোমিটার খুব কম অথচ রাবার ক্ষয়ে গেছে আর চেইন ঢিলা, এ হিসাব মেলে না।
- নিজের লাইসেন্স আর হেলমেট নিয়ে ফাঁকা রাস্তায় টেস্ট রাইড দিন। সব গিয়ার ওঠানামা করুন, মাঝারি গতি থেকে একবার জোরে ব্রেক করুন, হালকা হাতে সোজা চালিয়ে দেখুন এক পাশে টানে কি না, আর হর্ন, লাইট, ইন্ডিকেটর, সেলফ স্টার্ট আর কিক (থাকলে) পরীক্ষা করুন।
- টাকা দেওয়ার আগে নিজের বিশ্বস্ত মেকানিক দিয়ে দেখান, বিক্রেতার আনা মেকানিক দিয়ে নয়। ওপরের কোনো কিছু নিয়ে খটকা লাগলে সেটা দেখিয়ে দাম কমান, নয়তো কেনা বাদ দিন।
সাধারণ ভুল
- ওই মডেল আর বছরের সাধারণ সেকেন্ড-হ্যান্ড দামের চেয়ে অনেক কম দাম দেখে লাফিয়ে পড়া। এর পেছনে সাধারণত থাকে চুরির বাইক, বন্যা বা দুর্ঘটনার ক্ষতি, অথবা কাগজ নেই বা হস্তান্তর করা যায় না। বাড়তি সাবধান হোন, নয়তো সরে আসুন।
- আসল কাগজ দেখা আর নিজে নম্বর মেলানোর আগেই বাইক 'আটকে রাখতে' অগ্রিম টাকা দেওয়া।
- 'কাগজ পরে দেব' কথায় কেনা, বা শুধু রেজিস্ট্রেশনের ফটোকপি দেখে কেনা।
- রাতে, বৃষ্টিতে বা সদ্য ধোয়ার পর বাইক দেখা। পানি লিক লুকায়, আর অন্ধকারে টোল আর ধোঁয়া চোখে পড়ে না।
- রসিদ ছাড়া 'গতকালই অয়েল বদলেছি' কথায় ভরসা করা। নতুন অয়েল দুধের মতো বা ধাতুর কণা মেশানো পুরনো অয়েল ঢেকে দিতে পারে, তাই বিক্রির ঠিক আগে কেন বদলানো হলো জিজ্ঞেস করুন।
- অয়েল কুলারকে রেডিয়েটর ভেবে ভুল করা। অয়েল-কুলড বাইকে কুল্যান্ট নেই; কেউ যদি বলেন 'রেডিয়েটরে পানি দিয়েছি', তাহলে ক্ষতিই করেছেন।
কখন মেকানিকের কাছে যাবেন
- সবসময়, টাকা দেওয়ার আগে। ছোট একটা পরীক্ষার খরচ ভুল বাইক কেনার ক্ষতির চেয়ে অনেক কম।
- নীল ধোঁয়া, ঠকঠক শব্দ, ক্লাচ স্লিপ বা এক পাশে টানা: রাজি হওয়ার আগে কম্প্রেশন টেস্ট বা ফ্রেম চেক করিয়ে মেরামতের খরচ জেনে নিন।
- কুলার বা তার লাইনে অয়েল চুইয়ে পড়া, বা দুই অয়েল বদলের মাঝে লেভেল কমে যাওয়া।
এটি সাধারণ কমিউটার মোটরসাইকেলের জন্য সাধারণ পরামর্শ। আপনার বাইকের প্রেসার, সময় আর অয়েল গ্রেডে ওনার্স ম্যানুয়ালই শেষ কথা। নিশ্চিত না হলে বিশ্বস্ত মেকানিকের পরামর্শ নিন।